Queen Of Bollywood Rekha Birthday Celebration: আজ, ১০ই অক্টোবর, ভারতীয় চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী রেখা (Rekha) ৭১ বছরে পদার্পণ করলেন। দীর্ঘকাল ধরে সাধারণ মানুষ তাঁকে রহস্যময়ী ডিভা, কাঞ্জিভরম শাড়িতে আবৃত স্টাইল আইকন এবং সিনেমার পর্দায় গ্ল্যামারাস নায়িকা হিসেবে দেখে এসেছেন। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ‘উমরাও জান’ বা ‘সিলসিলা’-র মত কালজয়ী সিনেমা তাঁর এই জাদুকরী ভাবমূর্তি তৈরির জন্য দায়ী।
তবে সত্যি হল, রেখাকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করতে হলে তাঁর এই চাকচিক্যের বাইরের অভিনয় ক্ষমতাকেও দেখতে হবে। তাঁর সেই অদম্য অভিনয় দক্ষতা তাঁকে ভারতীয় সিনেমার অন্যতম বহুমুখী ও শক্তিশালী শিল্পীতে পরিণত করেছে। রেখা কেবল একজন অভিনেত্রী নন, তিনি একজন ‘অ্যাক্টরস অ্যাক্টর’।
রেখার অভিনয় জীবনের যাত্রাপথ মসৃণ ছিল না
রেখার এই ‘ডিভা’ হয়ে ওঠার পথ যথেষ্টই কঠিন ছিল। ষাটের দশকের শেষ দিকে যখন তিনি বলিউডে প্রথম আসেন, তখন অনেক সমালোচক তাঁকে ‘কালো, মোটা এবং আনাড়ি’ নতুন শিল্পী হিসেবে বিদ্রূপ করতেন। প্রথমে, তাঁকে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক সিনেমায় একজন ‘সেক্স সিম্বল’ হিসেবে দেখানো হত।
এই কঠিন সমালোচনা রেখার মধ্যে একটি শক্তিশালী সংকল্প তৈরি করে। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে তাঁর হিন্দি ও উর্দু ভাষার উন্নতি করেন, অভিনয়ে আরও মনোযোগ দেন এবং নিজের শারীরিক গঠনে পরিবর্তন আনেন।
টার্নিং পয়েন্ট: রেখা যে শুধু ‘সুন্দরী’ নন, একজন ভালো অভিনেত্রীও- এটি প্রথম প্রমাণিত হয় ১৯৭৮ সালের ‘ঘর’ সিনেমার মাধ্যমে। এই সিনেমায় তিনি একজন সাধারণ গৃহিণীর চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন জয় করেন।
রেখা-অমিতাভ জুটির জাদু
রেখার বর্ণময় কর্মজীবনের কথা আলোচনা করতে গেলে, অমিতাভ বচ্চন-এর সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত জুটির কথা উল্লেখ করতেই হয়। ‘দো আনজানে’ (১৯৭৬), ‘মুকদ্দর কা সিকন্দর’ (১৯৭৮), ‘মিস্টার নটবরলাল’ (১৯৭৯) অথবা ‘সুহাগ’ (১৯৭৯(-এর মত সিনেমাগুলোতে তাঁদের একসঙ্গে কাজ করা দর্শকদের মাঝে অন্যরকম উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। তবে তাঁদের সবচেয়ে বেশি আলোচিত সিনেমা ছিল ১৯৮১ সালের ‘সিলসিলা’, যেখানে তাঁরা অবৈধ প্রেমিক-প্রেমিকার ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শকদের মনে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন।
যখন গ্ল্যামার সরিয়ে শুধুই অভিনয়
রেখার প্রকৃত প্রতিভা এবং অভিনয়ের গভীরতা সেই ছবিগুলোতে দেখা যায়, যেখানে তিনি সচেতনভাবে তাঁর গ্ল্যামারাস ভাবমূর্তি ত্যাগ করেছিলেন।
‘খুবসুরত’, ১৯৮০: হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের এই ছবিতে রেখা মঞ্জু নামের একটি চরিত্রে প্রাণবন্ত এবং স্বতঃস্ফূর্ত কমেডিয়ান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এখানে কোনো গ্ল্যামার ছিল না, তিনি ছিলেন এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে আনন্দ এবং দুষ্টুমিতে ভরা এক প্রাণবন্ত চরিত্র।
‘কলিযুগ’, ১৯৮১: শ্যাম বেনেগালের মহাভারতের আধুনিক উপস্থাপনা এই প্যারালাল সিনেমায় রেখা দ্রৌপদীর অনুপ্রেরণায় তৈরি সুপ্রিয়া চরিত্রে অভিনয় করেন। এই চরিত্রে তিনি ছিলেন শান্ত, কিন্তু শক্তিশালী এক ব্যক্তিত্ব।
‘উমরাও জান’, ১৯৮১: এই সিনেমাটি কীভাবে কেউ ভুলতে পারে? এই ছবি রেখার সাফল্যের অন্যতম শিখর। এই বিখ্যাত পিরিয়ড ড্রামায় তওয়াইফ এবং কবিরের ভূমিকায় তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। এই সিনেমার জন্য রেখা শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন।
‘ইজাজাত’, ১৯৮৭: কিংবদন্তি গুলজার পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে সুধা চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অত্যন্ত দক্ষতাপূর্ণ। বিবাহবিচ্ছেদ হওয়া এক নারী বৃষ্টিমুখর রাতে তাঁর প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে আবার মিলিত হন। রেখার সূক্ষ্ম, লুকানো কষ্ট এবং দ্বিধা প্রকাশ এই চলচ্চিত্রে বিশেষভাবে ফুটে উঠেছিল।
‘আস্থা’, ১৯৯৭: বাসু ভট্টাচার্য পরিচালিত এই বিতর্কিত চলচ্চিত্রে রেখা আর্থিক প্রয়োজনে একজন উচ্চ শ্রেণির যৌনকর্মী হওয়া এক স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন। এটি ছিল মধ্যবিত্ত সমাজের নৈতিকতার একটি সাহসী পরীক্ষা এবং রেখার চরিত্রের প্রতি তাঁর গভীর অঙ্গীকার প্রমাণ করে।
এই কাজগুলো প্রমাণ করে, রেখা কেবল একজন গ্ল্যামারাস নায়িকা নন, বরং তিনি বলিউডের একজন বিরল এবং বহুমুখী শিল্পী। তিনি শুধুই অভিনেত্রী নন, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁর জন্মদিনে তাঁর প্রতি রইল সশ্রদ্ধ প্রণাম ও ভালোবাসা।