Megha Majumdar National Book Award Finalist: কলকাতার একটি গল্প আমেরিকার অন্যতম সেরা সাহিত্য পুরস্কার ‘ইউএস ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ডের’ (US National Book Award) জন্য মনোনীত হয়েছে। মেঘা মজুমদারের ‘দ্য গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ’ নামক বইটি এই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত পাঁচটি কল্পকাহিনী বইয়ের মধ্যে একটি (Megha Majumdar National Book Award Finalist), যা আগামী মাসে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রদান করা হবে।
এর আগে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড-এ সল বেলোর মত বিখ্যাত সাহিত্যিকরা পুরস্কৃত হয়েছেন। ঝুম্পা লাহিড়ী ২০১৩ সালে এই পুরস্কারের জন্য শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অ্যাওয়ার্ড-এর থেকেও বেশি কিছু
মজুমদারের (Megha Majumdar) প্রথম উপন্যাস, ‘দ্য বার্নিং’, কলকাতার পটভূমিতে রচিত, যা ২০২০ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড-এর জন্য অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে বাছাই করা হয়েছিল। তিনি যদি ‘দ্য গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ’ এর জন্য এই পুরস্কার জেতেন, তবে তিনি হবেন প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি যিনি এই পুরস্কার জিতবেন।
তবে, মেঘা মজুমদার ইতিমধ্যেই এমন স্বীকৃতি অর্জন করেছেন যা সম্ভবত জাতীয় বই পুরস্কারের চেয়েও বেশি লাভজনক হতে পারে। আমেরিকান টক শো-এর উপস্থাপিকা এবং সেলিব্রিটি অপরাহ উইনফ্রে-র নেতৃত্বাধীন অপরাহ বুক ক্লাব, ‘দ্য গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ’ নামক বইটিকে ২০২৫ সালের উল্লেখযোগ্য কল্পকাহিনীগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে ঘোষণা করেছে। তারা জানিয়েছে যে অপরাহ প্রথম পৃষ্ঠা থেকেই ‘মন্ত্রমুগ্ধ’ হয়েছিলেন।
আর বলে রাখা ভালো যে এই অপরাহ বুক ক্লাবের সাজেশন মানুষ পছন্দ করে। তার একটি উদাহরণ হল – লেখক এবং চিকিৎসক আব্রাহাম ভার্গিসের (Abraham Verghese) ‘দ্য কভেন্যান্ট অফ ওয়াটার’ (The Covenant of Water) ২০২৩ সালের মে মাসে বুক ক্লাব কর্তৃক সুপারিশকৃত হওয়ার পর থেকে দুই মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে।
মেঘা মজুমদারের উপন্যাসের প্রশংসা করে অপরাহ বলেন, “মেঘা মজুমদার একজন অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন লেখিকা, যিনি চরিত্র ও সংস্কৃতির সংঘাতের গভীরতা পর্যন্ত আমাদের নিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন। ‘গার্ডিয়ান’ কে ছিলেন আর ‘থিফ’ কেই বা ছিলেন, তা নিয়ে আমি এখনও ভাবছি।”
প্রসঙ্গত, ৩৮ বছর বয়সী মেঘা মজুমদার ওপরাহ উইনফ্রেকে তার বইয়ের প্রশংসা করতে শুনে সেই অভিজ্ঞতাকে “আমার জীবনের প্রেক্ষাপটের বাইরে” বলে বর্ণনা করেছেন।
‘দ্য গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ’-এর বিশেষত্ব
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্ভিক্ষের কারণে বিপর্যস্ত ভবিষ্যতে কলকাতার প্রেক্ষাপটে উপন্যাসটি রচিত। ‘দ্য গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ’ নামক উপন্যাসটি একটি চুরি যাওয়া মানিব্যাগের সূত্র ধরে সাত দিনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে কিছু মানুষের জীবন এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান সুবিধা ও টিকে থাকার দ্বন্দ্বের গল্প তুলে ধরে। প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ওপরাহর সমর্থন মেঘা মজুমদারকে কলকাতার সাহিত্যাঙ্গনে এক নতুন ও আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত করবে।
‘দ্য গার্ডিয়ান অ্যান্ড আ থিফ’ উপন্যাসটি মর্যাদাপূর্ণ কার্কাস পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। এই তালিকায় কিরণ দেশাইয়ের ‘দ্য লোনলিনেস অব সোনিয়া অ্যান্ড সানি’ উপন্যাসটিও ছিল, যেখানে মহাদেশ ও প্রত্যাশার মাঝে আটকে থাকা এক দম্পতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গল্পের প্রেক্ষাপট
অন্যান্য অনেক উপন্যাসের মত এই বইটিতেও কলকাতা একটি প্রধান পটভূমি হিসাবে কাজ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শহরটি এক ভয়াবহ, দুর্ভিক্ষ-পীড়িত এবং প্রায়শই বন্যা কবলিত একটি মহানগরীতে (megalopolis) রূপান্তরিত হয়েছে।
ধনী ও দরিদ্রদের জীবনযাত্রার পার্থক্য তুলে ধরাই মেঘা মজুমদারের লেখার বৈশিষ্ট্য। এই বইটিতে, ‘মা’ ও তার পরিবার ধনী পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা মিশিগানে স্থানান্তরিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কারণ তার স্বামী সেখানে একজন বিজ্ঞানী হিসাবে চাকরি পেয়েছেন। ‘মা’ তার মেয়ে ও বাবার নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা ‘জলবায়ু ভিসা’ (climate visas) পেয়েছে এবং সাত দিনের মধ্যে তাদের যাত্রা করার কথা।
অন্যদিকে, দরিদ্রদের প্রতিনিধিত্ব করে বুম্বা, যে ‘মা’ কর্তৃক পরিচালিত একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করে। গ্রাম ছেড়ে আসার পরে, সে ধনী পরিবারগুলোর বিলাসিতা দেখে বিস্মিত হয়ে যায়. তরুণ চোর বুম্বা, ‘মা’-এর বাড়িতে খাদ্যের অনুসন্ধানে ঘোরাঘুরির সময়ে, জীবন রক্ষাকারী ভিসা সম্বলিত মানিব্যাগটি চুরি করে। সম্প্রতি তার বিধ্বস্ত গ্রাম থেকে কলকাতায় আসা বুম্বা তার পরিবারকে বাঁচাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, যদিও কলকাতার বৈষম্য তাকে পদে পদে মোকাবিলা করতে হয়।
মজুমদার লিখেছেন, “বুম্বার পরিবারের কি এমন জীবনের সামান্যতম অংশও পাওয়ার অধিকার নেই – যার অর্থ একটি বাড়ি যেখানে মশা, বৃষ্টির জল অথবা চোর তাদের ওপর অত্যাচার করতে পারবে না?”
ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড ফাইনালিস্ট মেঘা মজুমদার (Megha Majumdar National Book Award Finalist)
মজুমদার (Megha Majumdar) কলকাতায় বড় হয়েছেন এবং ১৯ বছর বয়সে হার্ভার্ডে Social Anthropology নিয়ে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান, এরপর জনস হপকিন্স থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। তিনি বাংলায় কথা বলে বড় হয়েছেন এবং নিজেকে বিনয়ের সঙ্গে এভাবে বর্ণনা করেন- “আমি একসময় ভারতের একটি মেয়ে ছিলাম যে ইংরেজি ভাষা শিখতে সংগ্রাম করত। আমার জীবনে এমন মোড় আসতে পারে, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি।”
পড়াশোনার পর, মজুমদার সাত বছর নিউ ইয়র্কের প্রকাশনা সংস্থা ক্যাটাপাল্টে কাজ করেন এবং ২০২১ সালে প্রধান সম্পাদক হন। এক বছর পর তিনি চাকরি ছেড়ে দেন এবং বর্তমানে লেখালেখি ও শিক্ষকতার মধ্যে সময় ভাগ করে নেন, তার জীবন নিউ ইয়র্ক এবং কলকাতার মধ্যে বিভক্ত। তিনি তার সর্বশেষ উপন্যাসটি তৈরি করতে ছয় বছর ব্যয় করেছেন। তার এখন দুটি সন্তান রয়েছে এবং তিনি বলেন যে মা হওয়াটা তার দ্বিতীয় উপন্যাসের “আবেগগত কেন্দ্রবিন্দু খুঁজে পেতে” সাহায্য করেছে।
উল্লেখ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষম্য যখন বিশ্বকে নতুনভাবে তৈরি করছে, তখন মেঘা মজুমদার কলকাতার সাহিত্যিক অঙ্গনে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি প্রমাণ করছেন যে, তিনি একজন লেখক হিসেবে ভবিষ্যতের সমস্যাগুলোর নৈতিক, সামাজিক এবং আবেগগত জটিলতাগুলো উপলব্ধি করতে সক্ষম।