Dark Side of Loan App Harassment You Never Expected: ভারতে ঋণের ব্যাপারে হয়রানির ঘটনাগুলো খুব একটা সামনে আসে না। সাধারণত, যখন কেউ কয়েক সপ্তাহ ধরে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়, তখন তা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে থাকে। প্রথমে সাধারণ একটা তাগাদা হিসেবে শুরু হলেও, এটা খুব তাড়াতাড়ি আরও খারাপ রূপ নেয়। অভিযোগ আসা শুরু হয়, টাকার অঙ্ক পাল্টাতে থাকে, কথা বলার সুর কড়া হতে থাকে, এবং শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যায়। সারা দেশে, এই পরিবর্তন ভারতে খুব দ্রুত বাড়তে থাকা ঋণ ব্যবস্থার একটা চেনা বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কী বলছে সমীক্ষা?
ভারতের ঋণ আর ঋণ নিয়ে সমস্যা (debt and loan dispute resolution) সমাধানের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম যার নাম এক্সপার্ট প্যানেল- তার প্রতিষ্ঠাতা অনুরাগ মেহরা বলছেন, “এটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে,” তিনি আরও বললেন, “ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের (RBI) কঠোর নির্দেশিকা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ দুর্বল। ঋণগ্রহীতারা প্রতিদিনই ভয়, হুমকি এবং অপমানের সম্মুখীন হন।”
অনুরাগ মেহরার টিম বিভিন্ন ধরণের আয়ের এবং অঞ্চলের ঋণগ্রহীতাদের সাথে কাজ করে। তাদের মধ্যে কিছু স্বল্প আয়ের মানুষ আছেন, যাদের আয় সামান্য এবং তাদের নির্দিষ্ট কোনও যায় নেই। আবার কিছু মধ্যম আয়ের বেতনভুক্ত কর্মচারী আছেন, যাদের আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য নিত্যদিনের খরচ তাদের বেতনের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। অনেক ঋণগ্রহীতাকে এমন ঋণ দেওয়া হয়েছিল, যা অনুমোদন করা উচিত ছিল না।
এই প্রসঙ্গে অনুরাগ মেহরা একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন যেখানে প্রায় ৩০,০০০ টাকা মাসিক আয় করা একজন ব্যক্তি বিভিন্ন ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২০ লক্ষ টাকা ঋণ নিতে পেরেছিলেন। তাঁর মতে, ঋণ দেওয়ার তাড়াহুড়োর কারণে কিছু নতুন প্ল্যাটফর্ম (new-age platforms) প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই এড়িয়ে গিয়েছে।
সাধারণত ঋণগ্রহীতারা একটি অথবা দুইটি ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে শুরু করেন, কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন অ্যাপ থেকে পাঁচ থেকে দশটি পর্যন্ত ঋণ নিয়ে জটিলতায় পড়েন, যা পরিশোধ করা তাদের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়।
নিত্য নতুন ঋণের ফাঁদ (Dark Side of Loan App Harassment You Never Expected)
সাম্প্রতিক সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারগুলোর আর্থিক সমস্যা আরও বাড়ছে। বেতন যেভাবে বাড়ার কথা ছিল, সেই হারে না বাড়লেও পরিবারগুলো এখন অনেক ক্রেডিট কার্ড, Buy Now, Pay Later স্কিম এবং বড় আকারের ইএমআই-এর মাধ্যমে তাদের খরচ চালাচ্ছে।
ক্রেডিট কার্ডে অল্প কিছু টাকা পরিশোধ করে সাময়িকভাবে স্বস্তি পাওয়া গেলেও, এটা দ্রুত আর্থিক অবস্থাকে খারাপ করে দেয়। দ্রুত ঋণ দেওয়ার অ্যাপের বিপদ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলো তেমন কাগজপত্র ছাড়াই খুব সহজে ঋণ দেয় এবং এদের মধ্যে অনেকগুলোই অস্বচ্ছভাবে কাজ করে।
২০২৪ সালের এক সার্ভেতে কয়েকশ’ সন্দেহজনক ঋণ অ্যাপ চিহ্নিত করা হয়েছে এবং ৮০০র বেশি অ্যাপকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ঋণগ্রহীতারা প্রায়ই আর্থিক কষ্টের কারণে খুব বেশি চিন্তা না করেই এই ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে যাচ্ছে।
এই ডিজিটাল ঋণ অ্যাপগুলো ঋণের উপর অনেক বেশি সুদ নেয়, যা কখনও কখনও বার্ষিক হারে কয়েকশ শতাংশ পর্যন্ত হয়। এর ফলে স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসেবে যা শুরু হয়, তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ঋণগ্রহীতারা আগের ঋণ পরিশোধ করার জন্য নতুন ঋণ নিতে বাধ্য হয় এবং এই ঋণের চক্র আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ঋণ পুনরুদ্ধার করতে গ্রাহককে হয়রানি
ভারতে ঋণ পুনরুদ্ধারের পদ্ধতি প্রায়শই অত্যন্ত কঠোর এবং অনৈতিক হয়ে থাকে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বার বার বেআইনি অনলাইন ঋণ প্রদানকারী সংস্থা বা অ্যাপস সম্পর্কে সতর্ক করেছে, যারা অতিরিক্ত চার্জ ধার্য করে এবং জোর করে আদায়ের পদ্ধতি ব্যবহার করে।
ঋণ আদায়কারীরা ঋণগ্রহীতাদের কর্মক্ষেত্রে প্রকাশ্যে অপমান করা, খারাপ ভাষায় ফোন করা এবং ভয় দেখানোর মত কৌশল অবলম্বন করে হয়রানি ও ভয় দেখিয়ে থাকে।
বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণাতেও এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে, যেখানে ব্যক্তিগত যোগাযোগের অপব্যবহার এবং ডেটা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মত ঘটনাগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই হয়রানিগুলো (Dark Side of Loan App Harassment You Never Expected) শুধু ঋণগ্রহীতাকে নয়, তাদের পরিবারকেও টার্গেট করে করা হয়।
এই হয়রানির ফলস্বরূপ মারাত্মক ঘটনাও ঘটেছে যেমন তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটক পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে যে, তাৎক্ষণিক ঋণ অ্যাপের মাধ্যমে হওয়া হয়রানির সঙ্গে তেলেঙ্গানায় বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও, কর্ণাটকেও এক মাসে ক্ষুদ্রঋণ-এর চাপের কারণে চারটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। গুজরাটে সুদের ওপর সুদ আদায়কারী ঋণদাতাদের ক্রমাগত ভয় দেখানোর কারণে একটি পরিবার আত্মহত্যা করেছে। সুইসাইড নোটে অনেক ক্ষেত্রে রিকভারি এজেন্টদের সরাসরি দায়ী করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণহীন ঋণ ব্যবস্থা
ভারতের ডিজিটাল ঋণদান ব্যবস্থা এবং এর পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্টভাবে দেখা যায়। যদিও RBI ডিজিটাল ঋণদাতাদের জন্য কঠোর নিয়মকানুন জারি করেছে (যেমন সুদের হার ও ঋণের উৎস প্রকাশ), বাস্তবে এই নিয়মগুলোর প্রয়োগে ভিন্নতা দেখা যায়।
ঋণ খেলাপি হওয়ার মূল কারণগুলি কী কী?
সাধারণত, ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণগুলো ব্যক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে আর্থিক চাপের সঙ্গে বেশি জড়িত। এর প্রধান কারণগুলো হল- চাকরি হারানো, বেতন কমে যাওয়া এবং আয়ের তুলনায় বেশি কিস্তির ইএমআই চাপ।
দেখা গিয়েছে যে ঋণ নেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য প্রায়শই স্বাস্থ্যসেবা, বিয়ে অথবা শিক্ষার মত পারিবারিক খরচ অথবা ক্রেডিট কার্ডের দেনা পরিশোধের জন্য ঋণ নেওয়া, কোনও দায়িত্বজ্ঞানহীন খরচের জন্য নয়।
বাড়তে থাকা সংকট ও পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনা ও মীমাংসার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ নিষ্পত্তি করতে সাহায্য করছে। ভারতে ঋণের বিস্তার দ্রুত বাড়ছে, তবে এর সাথে সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলো সমান তালে চলতে পারছে না। ঋণ পাওয়ার সহজলভ্যতা এখন একটিমাত্র EMI মিস করার পরেই চরম চাপ, অপমান এবং দুঃখজনক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
নিয়মকানুন থাকা সত্ত্বেও, দুর্বল প্রয়োগের ফলে ঋণগ্রহীতারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং এর থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘ সময়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। এই ক্রমবর্ধমান আর্থিক সমস্যায় ঋণ নেওয়ার সহজলভ্যতার সাথে সুরক্ষার সহজলভ্যতা মেলানো অত্যন্ত জরুরি।
